আদর, দোয়া, কোমলতা ও সুন্দর আচরণে চক্ষুশীতলকারী সন্তান গড়ে তোলা যায়।
আসুন এই সম্পর্কে আমরা আরো গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে বিস্তারিত জেনে নিই,,,
সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহামূল্যবান আমানত। প্রত্যেক বাবা-মায়ের স্বপ্ন থাকে—তার সন্তান যেন আদর্শবান, দায়িত্বশীল, কোমল হৃদয়ের এবং চক্ষুশীতলকারী মানুষ হয়ে বড় হয়। কিন্তু শুধুমাত্র শাসন বা নিয়ম দিয়ে নয়, বরং ভালোবাসা, দোয়া, ধৈর্য্য ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমেই একটি শিশুর মনকে গড়ে তোলা সম্ভব।
অনেক সময় আমরা ভাবি, “কিভাবে সন্তানকে এমনভাবে গড়ে তুলব যাতে সে নিজের ইচ্ছাতেই ভালো কাজ করতে চায়?”
এর উত্তর লুকিয়ে আছে পজিটিভ প্যারেন্টিংয়ের মাঝে।
১. দোয়া—প্যারেন্টিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি
সন্তানকে গড়ে তোলার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো দোয়া। বিশেষ করে “সূরা আল-ফুরকান” এর ৭৪ নম্বর আয়াতের দোয়া একজন মুমিন অভিভাবকের জীবনের অংশ হওয়া উচিত।
وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
বাংলা উচ্চারণ: ওয়াল্লাযীনা ইয়াকূ লূনা রাব্বানা-হাবলানা-মিন আঝওয়া-জিনা-ওয়া যুররিইইয়া-তিনা কুররাতা আ‘ইউনিওঁ ওজ্‘আলনা-লিলমুত্তাকীনা ইমা-মা-।
অর্থ: এবং যারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানের পক্ষ থেকে আমাদের জন্যে চোখের শীতলতা দান কর এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্যে আদর্শস্বরূপ কর।
সন্তানের হিদায়াত, চরিত্র, আদব—সবকিছুই মূলত আল্লাহর তাওফিক। দোয়া সেই দরজাগুলো খুলে দেয়, যা আমাদের সাধ্যের বাইরে।
২. সন্তানকে প্রচুর আদর করুন
অনেক বাবা-মা মনে করেন বেশি আদর করলে সন্তান নষ্ট হয়ে যায়। অথচ কোমল আদর, কোলে নেওয়া, চুমু দেওয়া, জড়িয়ে ধরা—এসব শিশুর মানসিক বিকাশে অসাধারণ প্রভাব ফেলে।
একটি শিশু যখন অনুভব করে যে সে নিঃশর্তভাবে ভালোবাসা পাচ্ছে, তখন তার ভেতরে নিরাপত্তাবোধ তৈরি হয়। সে আত্মবিশ্বাসী হয়, কোমল হয় এবং বাবা-মায়ের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই অনুগত হয়ে ওঠে।
৩. ছোট কাজেও প্রশংসা করুন
সন্তান যখন ভালো কিছু করে, তখন সবচেয়ে বেশি চায় বাবা-মায়ের মুখে প্রশংসা শুনতে।
একটা ছোট কাজ হলেও তাকে বলুন—
“মাশাআল্লাহ”
“তুমি খুব সুন্দর কাজ করেছ”
“আমি তোমাকে নিয়ে গর্বিত”
এই ছোট ছোট প্রশংসাগুলো শিশুর মনে বিজয়ের অনুভূতি তৈরি করে। সে আরও ভালো কাজ করতে আগ্রহী হয়।
৪. সন্তানকে সময় দিন ও কথা শুনুন
শিশুরা অনেক প্রশ্ন করে। কখনো কখনো সেই প্রশ্নগুলো বিরক্তিকরও মনে হতে পারে। কিন্তু এটাই তাদের শেখার সময়।
যখন সন্তান প্রশ্ন করে, তখন ধৈর্য্য নিয়ে উত্তর দেওয়া খুব জরুরি। কারণ সে যদি বাবা-মায়ের কাছে উত্তর না পায়, একসময় বাইরের মানুষদের কাছেই সব জানতে চাইবে।
সন্তানের সবচেয়ে বড় বন্ধু হওয়া উচিত তার বাবা-মা।
সে যেন যেকোনো বিষয় নির্ভয়ে বাবা-মায়ের সাথে শেয়ার করতে পারে—এই পরিবেশ তৈরি করাই প্যারেন্টিংয়ের বড় দায়িত্ব।
৫. সন্তানের আগ্রহকে গুরুত্ব দিন
সন্তান যখন কোনো খেলনা দেখাতে চায়, কিছু বানিয়ে নিয়ে আসে, অথবা কোনো গল্প বলতে চায়—তখন মনোযোগ দিয়ে শুনুন।
শিশুর কাছে এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার ছোট্ট মনোযোগ ও উৎসাহ তার হৃদয়ে বিশাল জায়গা তৈরি করে। সে অনুভব করে—“আমি গুরুত্বপূর্ণ।”
৬. সন্তানকে ভালোবাসার কথা বলুন
অনেক সময় আমরা সন্তানকে ভালোবাসি, কিন্তু সেটা প্রকাশ করি না।
শিশুরা ভালোবাসা “অনুভব” করতে চায়।
তাকে জড়িয়ে ধরে বলুন—
“আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি”
“তুমি আমার খুব প্রিয়”
এই কথাগুলো শিশুর মানসিক জগতে গভীর নিরাপত্তা তৈরি করে।
৭. সন্তানদের সাথে খেলুন
খেলাধুলা শুধু আনন্দ নয়, এটা সম্পর্ক গভীর করার মাধ্যম।
লুকোচুরি, সুড়সুড়ি খেলা, কাঁধে নিয়ে ঘোরা—এ ধরনের ছোট ছোট খেলাগুলো শিশুদের মনকে উচ্ছ্বসিত করে তোলে।
ব্যস্ততার মাঝেও অল্প সময়ের আন্তরিক খেলাধুলা শিশুর জন্য অনেক বড় উপহার।
৮. টক্সিক কথা ও অতিরিক্ত বকাঝকা এড়িয়ে চলুন
অতিরিক্ত ধমক, অপমান, কড়া ভাষা—এসব শিশুর আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেয়।
একটা শিশু যদি সবসময় শুনতে থাকে—
“তুমি কিছুই পারো না”
“সবসময় ভুল করো”
তাহলে সে ধীরে ধীরে নিজেকেই মূল্যহীন ভাবতে শুরু করে।
শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য হাসিখুশি ও নিরাপদ পরিবেশ খুব গুরুত্বপূর্ণ।
৯. সুন্দর চিন্তা শেখান
শিশুদের ছোটবেলা থেকেই মহানুভবতা, সহানুভূতি, দায়িত্ববোধ ও দ্বীনি মূল্যবোধ শেখানো প্রয়োজন।
তাদের মনকে সুন্দর চিন্তা দিয়ে ভরিয়ে দিতে পারলে তারা বড় হয়ে সুন্দর মানুষ হবে ইন শা আল্লাহ।
১০. বাবা-মাকেও নিজের যত্ন নিতে হবে
একজন ক্লান্ত, অবসন্ন ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বাবা-মায়ের পক্ষে ধৈর্য্যশীল প্যারেন্টিং করা কঠিন।
নিজের বিশ্রাম, ঘুম, মানসিক প্রশান্তি—এসবও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাবা-মায়ের মানসিক অবস্থা সরাসরি সন্তানের উপর প্রভাব ফেলে।
১১. জোর করে কিছু চাপিয়ে দেবেন না
খাওয়ানো হোক বা কোনো অভ্যাস শেখানো—জোরাজুরি না করে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করতে হবে।
অতিরিক্ত চাপ শিশুর মনে ভয় ও বিরক্তি তৈরি করে।
ভালোবাসা ও কোমল আচরণ দিয়ে অনেক বেশি ফল পাওয়া যায়।
১২. সন্তানকে সম্মান করুন
শিশুরাও সম্মান বুঝে।
বারবার অপমান করা, অন্যের সামনে ছোট করা বা তুলনা করা তাদের আত্মমর্যাদাবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সম্মান পেলে শিশুরা নিজের প্রতিও সম্মানবোধ তৈরি করে।
১৩. শাসনের চেয়ে সম্পর্ক বেশি গুরুত্বপূর্ণ
প্যারেন্টিং মানে শুধু নিয়ম মানানো নয়।
প্যারেন্টিং মানে এমন এক সম্পর্ক তৈরি করা, যেখানে সন্তান নিরাপদ অনুভব করবে, ভালোবাসা পাবে এবং ভুল করলেও ফিরে আসার জায়গা খুঁজে পাবে।
১৪. জান্নাতের স্বপ্ন দেখান
শুধু দুনিয়াবি সফলতা নয়, সন্তানকে জান্নাতের স্বপ্নও শেখাতে হবে।
ভালো কাজ, সুন্দর চরিত্র, মানুষকে সাহায্য করা—এসবের উদ্দেশ্য যেন আল্লাহর সন্তুষ্টি হয়, সেই শিক্ষা ছোটবেলা থেকেই দিতে হবে।
উপসংহার
সন্তান গড়ে ওঠে শুধু কথায় নয়, বরং আচরণ, ভালোবাসা, দোয়া ও পরিবেশের মাধ্যমে।
কোমলতা, ধৈর্য্য, প্রশংসা, আন্তরিক সময় দেওয়া এবং নিঃশর্ত ভালোবাসা—এসবই একজন শিশুকে চক্ষুশীতলকারী সন্তানে পরিণত করতে সাহায্য করে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে উত্তম প্যারেন্টিং করার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের সন্তানদেরকে নেককার, দ্বীনদার ও চক্ষুশীতলকারী বানিয়ে দিন।
আমীন।